শনিবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৭, ৪ঠা জুলাই ২০২০
কবিতা
শুভ্র সরখেল
প্রীতিলতা
প্রীতিলতা!
তোর ঠোঁটের মোহে
আমার স্নায়ু অনেক ক্লান্ত! জল দে আমায়!
প্রীতিলতা!
তোর চুলের কালোয়
আমার মুখোশ অনেক মিথ্যা! রঙ দে আমায়!
প্রীতিলতা!
তোর চোখের লজ্জায়
আমার শরীর অনেক দুর্বল! শক্তি দে আমায়!
প্রীতিলতা!
তার কপালের ভাঁজে
আমার শুদ্ধতায় অনেক সন্দেহ! বিশ্বাস দে আমায়!
প্রীতিলতা!
তার গলার চিৎকারে
আমার অবয়ব অনেক শঙ্কিত! অভয় দে আমায়!
অপার অরণ্য
তারকাঁটা
নিরুত্তর ছত্রাক পেরিয়ে রক্তের ভেতরেও কিছু কিছুু
হা-হুতাশ ঢুকে গেছে আজ
শুধু পূর্ণ পকেট হাত দিলে সাপ সাপ ভ্রম হয়
মানুষের মুখ যেন ঘুঘুধরা ফাঁদ
বেলকনিতে আসেনা হৃদয়ভুক চাঁদ
তবু পাতাদের পাখিদের মানুষের দিকে দেখি
মানুষেরা নাই-
এই বিরহজীবন, কাঁটাছেঁড়া মুখ
এতো অসহ্য অসুখ নিয়ে বুকে কোন পাড়ে দাঁড়াই!
জানি মানুষের ভেতরে কাঁটা
শূন্যের ভেতরেও কাঁটাকাঁটা মানুষ
বাতাসে পতাকার বিলাসী বিলাপ
সীমান্তের প্রকাশ্য নৈরাজ্যের কাছে
উড়ে যায় আত্মনির্জন মানুষের শব
দূরত্ব ঋণ নিয়ে সব রাত মরে গেলে শুধু
মানুষের পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র দেয়াল!
প্রণবকুমার চক্রবর্তী
আমি তাই হাত পেতেই রইলাম
যদিও আসবে না জানি,
আসবেও না আর কোনদিন
তবুও
তোমাকে আজ
আবার বলছি করজোড়ে
ফিরে এসো
ফিরে এসো আরোও একবার
আমার এই ভাঙাচোরা ঘরে
এখানে
এখনও দাঁড়িয়ে আছে
মাথা উঁচু করে
শাল-পিয়ালের জঙ্গল
তোমার অপেক্ষায় .....
লাল মাটির পথে
অজয়, অঞ্জনা কিংবা
কোপাই নদির পাড়ে
ভালবাসা আর ভালোলাগার
সেই গান আর
সংলাপগুলো
অহরহ তোমাকে খুঁজে খুঁজে
ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ...
উদভ্রান্ত ঝোড়ো হাওয়ায়
ভেঙে যাচ্ছে সব ঘর-বাড়ি
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে পথ-ঘাট
অন্ধকারে
ঢেকে যাওয়া মধ্যাহ্নে
চারপাশে ধ্বনিত হচ্ছে
জরাজীর্ণ জীবনের আর্তনাদ ...
এখনই তোমাকে বড্ড প্রয়োজন আমাদের
বড্ড প্রয়োজন
ভয়ঙ্কর এই অন্ধকারকে প্রত্যাঘাত করে
আতঙ্কিত মনের অন্তস্থলে
ধ্বনিত করা
মানবিক নিস্ক্রমনের পথ আর
শ্বাশ্বত আনন্দের স্বাদ বন্টন করা
আমি
তাই তোমার আশায়
ভিখারীর মতো হাত পেতেই রইলাম ...
পত্রকাব্য
আপন রহমান
নিশিতাকে লেখা শেষ চিঠি
প্রিয় নিশিতা;
এখন তুমি কোথায় আছো?
কেমন আছো ? জানার জন্য মনটা বড় আনচান করে। কিন্তু, কি আর করার আছে?
আমি;
আমি কি আর আমার আছি?
-জোনাকির মত আজ অন্ধকারে মিশে গেছি। একে-একে সর্বস্ব হারিয়ে ...।
জীবনের অনেকটা ধাপ পেরিয়ে দেখি; আমি দাড়িয়ে আছি ফেরার পথহীন এক নিশিদ্ধ গলিতে। তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার সকল রাস্তা আজ হারিয়ে ফেলেছি আমি।
নিশিতা;
এখন আমার প্রতিটি মুহূর্ত, যন্ত্রণার অপর নাম। অপার্থিব কষ্টে মোড়া আমার পাথুরে জীবন। আমি এখন, কষ্ট রঙের পোষাক পরিহীত, অস্তিত্বহীন এক যুবক। নষ্ট সময়ের সাথে আজ আমার গভীর সখ্যতা।
এখন আমি, জীবন নামক কষ্ট নায়ের নষ্ট মাঝি। হারাতে- হারাতে হারানোর আমার আর কিছু নেই। ছিলে তুমি তাও আজ বিবর্ণ অতীত।
আজ বড় বেশি মনে পড়ে নিশিতা ফেলে আশা সেই সব দিন গুলোর কথা ...
যখন তুমি আমার অন্তরের অন্তস্থলের একচ্ছত্র অধিপতি। তুমি জড়িয়ে আছো আমার, প্রতি
নি:শ্বাসে-বিশ্বাসে-আমার স্বপ্নে - আমার সাধনায়।
আচ্ছা নিশিতা ;
তোমার কি মনে পড়ে - সেই দিনটির কথা। সেদিন ছিল এমনই এক বসন্তের গোধূলী লগ্ন। পুবের আকাশটা তখন ধারণ করেছিল রক্তিম বর্ণ। সারাটা দিন যে সূর্যকে বুকের জমিনে ধরে রেখে ছিলো আকাশ ; গোধূলী লগ্নে তাকে বিদায় জানাতেই হয়তো তার বুকে এমনিই রক্ত ক্ষরণ।
যেদিন আমার পবিত্র ভালোবাসাকে অস্বীকার করে তুমি বিদায় নিয়েছিলে আমার হৃদয় আকাশ থেকে। সেদিন ঠিক এমনই অবস্থা হয়েছিল আমার। এমনই রক্তক্ষরণ হয়েছিল আমার বুকেও!
আর এখন?
-রক্তই নেই তার আবার ক্ষরণ।
জানিনা এটা আমার প্রতি বিধাতার নিষ্ঠুরতা নাকি আমার পূর্ব জনমের পাপের ফল। পূর্ব জনম !!!
এ সম্পর্কে সত্যিই আমার বিশ্ময়ের সীমা নেই। পূর্ব জনম সম্পর্কে কখনও কখনও আমি প্রচন্ড বিশ্বাসী আবার কখনও কখনও প্রচন্ড অবিশ্বাসীও।
বিশ্বাসের কারণটা এরকম;
-নতুন কোথাও গেলে, নতুন কোন ঘটনা ঘটলে মাঝে মাঝে মনে হয় এ জায়গাটার সঙ্গে আমার কি যেন একটা যোগ সূত্র রয়েছে। আবার জীবনে আকশ্মিক ঘটে যাওয়া কোন-কোন ঘটনাকে মনে হয় একেবারে জীবন্ত। মনে হয় এ ঘটনা আমার জীবনে আগেও ঘটেছে এবং নিশ্চয়ই ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় ; না এটা ঘটেনি অথবা আদৌ ঘটা সম্ভব নয়। তখন মনের কোণে পূর্ব জনম শব্দটা উকি দিয়ে যায়। আবার মাঝে-মাঝে মনে হয় কিসের পূর্ব জনম! এসব হয়তোবা অবেচেতন মনের কল্পনার ফসল।
থাক ওসব কথা ।
আচ্ছা নিশিতা;
তোমার মনে পড়ে, সেই দিন গুলো ?
তখন তুমি সতের বছরের এক সুন্দরী হৃদয় স্পর্শী বালিকা । আমার তখন ঊনিশ।
ভাল বাসার পূর্ণ নীলচাঁদোয়ার নীল জোছনায় পরিপূর্ণ তখন আমাদের মন আসমান ।
আমার প্রতি নি:শ্বাসে তখন তুমি; বিশ্বাসেও। আমার কল্পনার আকাশ, ভাবনার সমুদ্র জুড়ে তখন এক মানসীর বিচরণ। সে তুমি, আমার নিশিতা।
আ: কোথায় সে দিনগুলো!!!
নষ্ট সময়ের বুকে সে দিন গুলোর সমাধি হয়েছে সেই কবে!
নিশিতা, আমার প্রাণের নিশিতা। বহুদিন হলো তোমাকে দেখিনা।
তুমি কি সেই আগের মতই আছো?
সেই কল্লোলিত নদীর মত শরীর, দীঘল কালো চুল-কাঁশের মত সাদা হৃদয় জমিন।
আর ; আর সেই জমিনের সমস্ত ভূখণ্ড জুড়ে আমি আমি আর
আমি ...।
একি, নিশিতা তুমি হাসছো? হাসবেই তো। যে উর্বর জমিনকে নিদারুন নিষ্ঠুরতায় মরুভ‚মিতে পরিণত করেছিলাম আমি নিজে। সেই আমিই কিনা এখন আবার ...।
কিন্তু ভেবে দেখো নিশি, ভুল কি শুধু আমারই ছিল? সেদিন আমি ছিলাম নিয়তির নীল দংশনের শিকার। ভেবেছিলাম সবাই আমাকে ভুল বুঝলেও তুমি অন্তত ...।
হায়রে নিয়তি !
তুমিই ভুল বুঝলে সবার আগে। চলে গেলে দূরে বহু দূরে; দূর অজানায় ...
যেভাবে; দুর্দিনে আমায় পর করেছে আমার কাছের মানুষ গুলো।
শুধু কাছের মানুষ ?
নিজের রক্তও আমার নিজেরই সঙ্গে করেছে বিশ্বাসঘাতকতা বার-বার!
নিশিতা;
তুমি আমায় প্রশ্ন করেছিলে। কেন আমি বেছে নিয়েছি এ স্বেচ্ছা নির্বাসন?
-কারণ একটাই- অবিশ্বাসী হয়ে তোমার সামনে থাকার চেয়ে,
ঢের ভাল এ স্বেচ্ছা নির্বাসন।
এখন ফেরার কথা বলছো?
না নিশি;
তুমি তো এখন তোমারও নেই আমারও নেই। তুমি এখন অন্যের। চোখের সামনে এ দৃশ্য দেখার চেয়ে নিবার্সন খারাপ কিসে? তবে মনে হয়, খুব বেশিদিন আর সইতে হবেনা আমাকে এ নরক যন্ত্রণা। মোমের মত গলে-গলে শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি। ক্রমশ ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে আমার জীবন প্রদীপ!
ইদানিং নিজের পা দুটিও নিজের সঙ্গে করে বিশ্বাস ঘাতকতা। বুঝি বিদায়ের ঘন্টা বাজতে শুরু করেছে ...!
চলে যাবো। একদিন সত্যি সত্যি চলে যাবো। আর ফিরে আসবোনা তেমাদের কাছে; তোমার কাছে। ভালো থেকো নিশিতা। আমার প্রাণের নিশিতা ...।
ইতি;
তোমার নীল
পূনশ্চ: তুমি নীল নামেই ডাকতে আমায়।
No comments:
Post a Comment